
সংবাদ রিপোর্ট : সাভারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলিতে গুরুতর আহত ব্যবসায়ী হারুন মিয়া (৪৮) হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও শরীরের ক্ষত এখনো শুকায়নি। আছে অসহ্য যন্ত্রনা। এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিনা পয়সায় চিকিৎসা মিললেও ব্যবসা বন্ধ থাকায় পরিবার নিয়ে কষ্টে আছেন তিনি। ওষধ কেনা এবং আনুসাঙ্গিক ব্যয় বহন করা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে কতো সময় লাগবে তা নিয়ে ভাবনায় পড়েছে তার পরিবার। গুলি করার পর মৃত ভেবে পুলিশ তাকে ভ্যানে তুলে দিয়েছিল অন্য লাশের সঙ্গে। ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরা হারুনের চোখমুখে এখনো আতঙ্কের ছাপ। পরিবার নিয়ে আগামীর দিনগুলো কিভাবে কাটবে সেই দুশ্চিন্তা ভর করেছে মাথায়। শরীরের এখনো জ¦ালা করে। টানা দেড়মাস হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও ক্ষতস্থান পুরোপুরি শুকায়নি। গায়ে কাপড় রাখলে শরীর জ¦লা করে। আয় রোজগার বন্ধ রয়েছে। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক পুত্র সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় ভালো নেই হারুন মিয়া। তার গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপঝেলার ঝিটকা। বিএনপির একজন সক্রিয় কর্মী এবং শেখ হাসিনা সরকারবিরোধী আন্দোলনে চেনা মুখ হলেও সাংগঠনিকভাবে কেউ খোঁজ নেয়নি তার। উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সহায়তা কামনা করেছেন হারুন ও তার পরিবার।

জানা গেছে, গত ৫ আগষ্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বিকেলে সাভার থানা বাসস্ট্যান্ড থেকে মডেল থানা পর্যন্ত সেদিন ছিল রণক্ষেত্র। ওইদিন বিকেলে পুলিশের গুলিতে নিহত ও আহত হন অনেকে। তাদের মধ্যে একজন গার্মেন্টসের স্টকলট ব্যবসায়ী হারুন। শরীরে তিনটি বুলেটের ক্ষতচিহ্ন নিয়ে বেঁচে আছেন তিনি। এখন তিনি অসহায় জীবনযাপন করছেন, হাঁটাচলাও তেমন করতে পারছেন না। বাসার একটি কক্ষে বিছানায় শুয়ে মোবাইল হাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ রেখে সময় পার করছেন তিনি।
সাভার পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সামনে রাজাবাড়ি মহল্লার বাসায় ১৮ অক্টোবর শুক্রবার দুপুরে আলাপকালে বিছানায় শুয়ে হারুন কাতর কন্ঠে এ প্রতিবেদককে তার কষ্টের কথা জানান। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট বিকেলে থানার গেটের কাছে ডাকঘরের সামনে দাঁড়িয়ে পুলিশের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন ‘শেখ হাসিনা সরকার পালিয়ে গেছে- আপনারা কার ওপর গুলি করছেন? এরা তো সবাই আপনাদের ভাই।’ ঠিক সেইমুহূর্তে হেলমেট পরহিত বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য তাকে ঘিরে ধরে গুলি করে। প্রথম গুলিটি লাগে তার বুকের বাম পাশে- এরপর আরো দুইটি গুলি তার ডান পায়ের উরু এবং হাটুতে বিদ্ধ হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হারুন মাটিতে লুটিয়ে পড়লে থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত এক ভ্যানচালককে বলেন- সে মারা গেছে, তাকে ভ্যানে তুলে দাও। পরে পুলিশ ও ভ্যানচালক তাকে ধরে আরো কয়েকটি লাশের সঙ্গে ভ্যানের উপর তুলেন। গুলিবিদ্ধ হারুন তখনো অবচেতন মনে পুলিশের কথাগুলো শুনছিলেন।
ভ্যানে থাকা কয়েকটি মরদেহের সঙ্গে ভ্যানচালক হারুনকে নিয়ে যান থানার অদূরে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ভ্যানে থাকা মরদেহ দেখতে এগিয়ে আসেন এক যুবক। তিনি গুলিবিদ্ধ হারুনকে নড়াচড়া করতে দেখে তার কাছে মোবাইল ফোন নম্বর জানতে চাইলে তিনি (হারুন) তার ছেলের মোবাইল নম্বর দেন। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ওই যুবক। পরে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পরিবারের সহায়তায় উন্নত চিকিৎসার জন্য এনাম মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। আহত হারুন জানিয়েছেন, তিনি বিএনপির একজন সমর্থক। কিন্তু সংগঠনে তার কোনো পদপদবী নেই। তিনি কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকে সক্রিয়ভাবে রাস্তায় থেকে আন্দোলনকারীদের উৎসাহ যোগান।
Leave a Reply