
সংবাদ রিপোর্ট : সাভারে প্রতারক ও দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য কমছে না। তাদের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা, চাকরি, জমি-জমা, বিদেশে পাঠানোসহ নানা বিষয়ে প্রতারণার অভিযোগ উঠছে দালাল চক্রের বিরুদ্ধে। প্রয়োজনীয় সেবা পেতে অনেক সাধারণ মানুষ এসব মধ্যস্বত্বভোগীর খপ্পরে পড়ে অর্থ ও সময় হারাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি থানা ও আশপাশে আছে এই চক্রের তৎপরতা। যারা বিভিন্ন মানুষকে মামলা দিয়ে হয়রানি করছে। ‘সাংবাদিক নামধারী’ প্রতারক চক্রের তৎপরতারও বেড়েছে। তারা থানা, রাইটারদের অফিস, উপজেলা পরিষদ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বাসা ও অফিসে যাতায়াত করে থাকে। বিগত সরকাররের সময়ও এই চক্র সক্রিয় ছিল। যাদের অনেকে মামলা বাণিজ্যে সম্পৃক্ত বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, ভূমি-সংক্রান্ত কার্যক্রম, আদালতকেন্দ্রিক কাজ, চাকরির প্রলোভন এবং বিভিন্ন ধরনের সেবা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে কিছু ব্যক্তি সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তারা অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন। অনেক ক্ষেত্রে টাকা নেওয়ার পর কাজ না করে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের কয়েকজন জানান, সরকারি দপ্তরে সরাসরি কাজ করতে গেলে দীর্ঘসূত্রতা বা প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনভিজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে দালালরা তাদের সহযোগিতার প্রস্তাব দেয়। পরে কাজের ধরন অনুযায়ী নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। কেউ কেউ দালালের মাধ্যমে কাজ করাতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনের একাধিক ফার্মেসী মালিক বলেছেন, কিছু লোক অহেতুক ঘুরাফেরা করে। তাদের কোনো কাজ নেই। বিভিন্ন লোককে সহযোগিতা করার নামে এরা মূরত প্রতারনা করে। এই চক্রের অনেকে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেয়। তারা থানা পুলিশের ঘনিষ্ট বলে পরিচয় দিয়ে লোকজনের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে থাকে। যাদের অনেকে পুলিশের সোর্স। সন্ধ্যার পর এদের আনাগোনা বারে। তারা বিশেষ উদ্দেশ্যে থানার আশেপাশে অবস্থান ও থানায় যাতায়াত করে গভীর রাত পর্যন্ত। তারা ফেসবুকে নানারকম পোষ্ট দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ায় এবং নিজেকে সংবাদিক পরিচয় দেয়। পুলিশের কিছু সদস্য এবং সাব-ইন্সপেক্টর না বুঝে গুরুত্ব দেয়ার সুযোগ নিচ্ছে প্রতারক চক্র। অনেক অপরাধী, মাদক কারবারিদের সঙ্গে সখ্যতা থাকায় নানা কৌশলে তারা থানায় ঘুরে তথ্য পাচার করে আসছে। যা তাদের নিয়মিত আয়ের অন্যতম উৎস্য। ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে থানা ভাংচুর, লুট ও অগ্নিসংযোগের পর এই চক্র থানায় সংস্কার কাজের কথা বলে অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। হত্যা মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে লাখ লাখ টাকা হাতানো চক্র এখনো সরব বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
উপজেলা পরিষদের চিত্রও অভিন্ন। নির্বাহী অফিসার, ভূমি, সমাজসেবা, মৎস্য কর্মকর্তার অফিসে দালাল ও প্রতারকদের আনাগোনা রয়েছে।
পৌর এলাকার একাধিক বাসিন্দার মতে, সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা, দ্রুত কাজ পাওয়ার প্রত্যাশা এবং কিছু ক্ষেত্রে দালালদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগে এ ধরনের প্রতারণা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সরকারি সেবার প্রক্রিয়া আরও সহজ ও স্বচ্ছ করা এবং দালালদের বিরুদ্ধে নিয়মিত নজরদারি জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতারণার শিকার হলে ভুক্তভোগীদের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা উচিত। কোনো কাজের জন্য অপরিচিত ব্যক্তির হাতে টাকা দেওয়ার আগে তার পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন যাচাই করার পরামর্শও দেওয়া হয়। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, দালালচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি জনগণকে সরকারি সেবা গ্রহণের নিয়ম, নির্ধারিত ফি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরশীলতা কমার পাশাপাশি প্রতারণার সুযোগও কমতে পারে। তবে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে প্রতারক ও দালাল চক্রের ব্যাপারে আগে সতর্ক হতে হবে।
Leave a Reply