
বিশেষ প্রতিনিধি: মানুষের চাপে সাভার যেন অপরিকল্পিত এক নগরীর প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। ঘনবসতির এই উপজেলায় ভাঙা রাস্তা, অটোরিক্সায় যানজট, চলার অনুপযোগী ফুটপাত, লোডশেডিং, গ্যাস সংকট, ড্রেনেজ অব্যবস্থাপনায় জলাবদ্ধতা, শিল্প সংস্কৃতির চর্চা ও খেলাধুলার উপযুক্ত পরিবেশ না থাকা, বৈদ্যুতিক খুটিতে বাতির স্বল্পতাসহ নানাবিধ সংকটে বাসিন্দারা দুর্ভোগে আছেন।
খুন, ধর্ষণ, মাদক, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, জঙ্গি আস্তানা, দখল এমন কোন অপরাধ নেই যা এখানে নেই। অপরাধ এখানকার মানুষের নিত্য সঙ্গি। পুলিশের দেওয়া ভাড়াটিয়া ফরম পূরণ না করে অপরাধী থাকছে নির্বিঘ্নে। বিশাল এলাকায় দুটি থানা, একটি ফাঁড়ি ও পাঁচটি পুলিশ ক্যাম্প জনবল ও যানবাহনের সংকটে হাপিয়ে উঠেছে।
জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকতা, নাগরিক ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, পরিবেশকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নের কারণে বহুমাত্রিক ভোগান্তির চিত্র পাওয়া গেছে। তাদের মতে, তিন দশক আগে থেকে যেভাবে স্থাপনা, মিলকারখানা স্থাপন করা হয়েছে তা তদারকি করা হয়নি। এভাবে চলতে থাকলে সাভার শিঘ্রই বসবাস অযোগ্য নগরীতে পরিণত হবে।
প্রায় ২৮০.১২ বর্গকিলোমিটার (১০৮.১৫ বর্গমাইল) আয়তনের সাভার উপজেলা একটি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। তিনটি সংসদীয় আসনের সীমানা অন্তর্ভুক্ত উপজেলায় মোট ভোটার ৯ লাখ ২৮ হাজার ৫৮৯ জন হলেও বসবাস করে প্রায় ৯০ লাখ মানুষ। এর বড় অংশ শ্রমজীবি ও নারী।
একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নে দুটি রপ্তানী প্রক্রিয়া অঞ্চল ছাড়াও তিন হাজার শিল্প কারখানার শ্রমিক প্রায় ৫০ লাখ। এসব কারখানায় ইটিপি নেই, যেগুলোর আছে তার ব্যবহার হয় না। আবাসিক এলাকায় যত্রতত্র কারাখানা গড়ে উঠছে। একইভাবে আবাসিক এলাকায় রয়েছে কয়েকশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে মানহীন ক্লিনিক। দুর্ভোগে নতুন যোগ হয়েছে ট্যানারি। পৌরসভা, রাজউক ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনুমোদন নিয়ে বা অনুমোদন ছাড়া গড়ে উঠা আবাসন প্রকল্প, বাসাবাড়ি, বহুভবন, কারখানা নির্মাণে নেই কোনো তদারকি। রাজস্ব আয়ের এই এলাকায় উন্নয়ন খাতে প্রতিবছর বরাদ্দ থাকলেও ঘনবসতিতে নেই পরিকল্পিত উন্নয়ন। সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, নদী দখল, আবর্জনার ভাগাড়, ভাঙা রাস্তা, ড্রেনেজ ও সড়ক বাতির স্বল্পতাসহ নানা অভিযোগ বাসিন্দাদের। ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদে বারবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। দেশের অন্যসব জায়গার মতো এখানেও আছে ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সার দাপট।
ব্যাংক কলোনী মহল্লার বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হলেও নাগরিক সুবিধা খুবই নিম্নমানের। সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এ যেন বাতির নিচে অন্ধকার এক শহর।
তৈয়বপুর গ্রামের বাসিন্দা বজলুর রহমান বলেন, ৬৪ জেলার মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে সাভারে বসবাস করে। তাদের চাপে আদি বাসিন্দারা এখানে সংখ্যালঘু। জনপ্রতিনিধি নির্বাচন থেকে শুরু করে যেকোন কাজে বিভিন্ন জেলার মানুষ এখানে বড় ফ্যাক্টর।
জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের সময় আসলে প্রতিদ্বন্দী প্রার্থীরা ক্লিন এবং গ্রীন সাভার গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বান্ধব নগরী গড়ার কথা বলেন। কিন্তু বদলায় না সাভারের চেহারা। বরং দুর্ভোগ নতুন করে আরো জেঁকে বসে। রাজনৈতিক দলের নেতার প্রশ্রয়ে অনেক অপরাধী দাপিয়ে বেড়ায়। কথার ফুলঝুঁড়িতে সীমাবদ্ধ থাকে নাগরিক সেবা।
পাথালিয়ার পানধোয়া গ্রামের আব্দুল মালেক জানান, সবকটি ইউনিয়নে কৃষি জমি ছিল। ধান, গম, সরিষাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির খ্যাতি ছিল সাভারের। গত তিন দশকে কৃষিপন্য উৎপাদন প্রায় বিলুপ্তির পথে। জমি ভরাট করে আবাসিক ভবন ও মিল কারখানা গড়ে উঠেছে।
সাভার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাইফুল ইসলাম বলেছেন, ‘দেশের সব এলাকার প্রায় ৯০ লাখ মানুষের বসবাস। এমন কোনো ধরনের অপরাধ নেই যা এখানে হয় না। এখানে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার কারখানায় ৫০ লাখ শ্রমিক কাজ করে। তিনি বলেন, কয়েক দশক আগেই অপরিকল্পিতভাবে সাভার গড়ে উঠেছে। যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে। রাজউকের ডিটেইলস এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) এর আওয়ায় এখন ভবন নির্মাণে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ দুষণ, কৃষি জমিতে আবাসন প্রকল্প, নদী-নালা দুষণ ও দখল, জলাবদ্ধতা, হকার, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি, বাল্যবিবাহসহ নানাবিধ সমস্যা এখানকার নিত্যদিনের চিত্র। সবকিছু সামলাতে প্রশাসনকে বেগ পোহাতে হয়। এর মধ্যেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।’
আইনশৃঙ্খলা সামলাতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। মামলার তদন্ত, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ভিআইপি প্রটোকলে পুলিশের বাহন ও জনবল ব্যস্ত থাকে প্রতিদিন। রাতে কিছুটা থাকলেও দিনে টহল থাকে না। এই সুযোগে অপরাধীরা অঘটন ঘটিয়ে সরে যায় নির্বিঘ্নে। সম্প্রতি সাভারে জঙ্গি আস্তানা এবং দুটি পেশার কুকার বোমা উদ্ধারের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলার নাজুক চিত্র নতুন করে সামনে এসেছে।
কুটুরিয়া গ্রামের বোরহান উদ্দিন বলেছেন, বৃষ্টি হলেই রাস্তায় চলা দুস্কর হয়ে পড়ে। দিনের বেলা মাদক কারবারি, বখাটে ও কিশোর গ্যাংয়ের আনাগোনা থাকে। জনসংখ্যা বাড়লেও নাগরিক সেবা ও মান বাড়েনি। বরং নিরাপত্তা নিয়ে উৎকন্ঠা তৈরি হয়েছে।
সাভার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন খান নঈম বলেন, জনসংখ্যার চাপে সাভার এখন বসবাস অযোগ্য হওয়ার পথে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে জনসংখ্যার অনুপাতে আরো থানা, ফাঁড়ি ও তদন্ত কেন্দ্র করার প্রয়োজন। এছাড়া, সাভার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও সাভার উপজেলা নিয়ে পৃথক সিটি কর্পোরেশন করা হলে নাগরিক সেবা কিছুটা হলেও বাড়বে।
সাভার সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাকিবুল হাসান ঈশান বলেন, জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশ ও যানবাহন খুবই কম। এজন্য বরাদ্দ বাড়ানো দরকার। ঘনবসতির এই এলাকায় একজন পুলিশ ১২-১৪ ঘন্টা টানা ডিউটি করে, যা অমানবিক। তিনি বলেন, ঢাকায় অপরাধ করে অনেকে সাভারে আত্নগোপন করে। জঙ্গি আটক ও বোমা উদ্ধারের পর ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ফরম পূরণ বাধ্যতামূলক করতে জোর দেওয়া হয়েছে। ঈশান বলেন, নারী, ধর্ষণ, অপহরণ নির্যাতন, মাদক, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও জমি সংক্রান্ত বিরোধে নিয়মিত মামলা হচ্ছে। অনেক অপরাধী ধরাও পড়ছে।
সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদ-এর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শামসুল হক বলেন, ইটিপি থাকলেও ব্যয় বহুল হওয়ায় ব্যবহার নেই। ট্যানারি দুষণ করছে ধলেশ্বরী নদী, বংশী নদী দখল করে স্টেডিয়াম বানানো হয়েছে। দখল, দুষণ বাড়ছেই। কোনো প্রতিকার নেই। এর সঙ্গে প্রভাবশালীরা জড়িত।
সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহ বলেন, এখানে সমস্যার অন্ত নেই। কোনটা রেখে কোনটা বলবো। সংকট নিরসনে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার।
সাভার চৌরঙ্গী সুপার মার্কেট দোকান মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ভাঙা রাস্তা, অটোরিক্সা, সড়ক বাতি সংকট, ফুটপাতের হকার ব্যবসার পরিবেশ বিঘ্নিত করছে। এসব নিরসনে পৌরসভায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দরকার।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, নাগরিক সেবার মান বাড়াতে সাভার পৌরসভার পরিধি বাড়ানো, আমিন বাজার ও আশুলিয়ায় পৃথক পৌরসভা করার কথা সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
একাধিক রুট: ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ছাড়াও সাভারে চারদিক দিয়ে ঢোকা ও বের হওয়া যায়। এর মধ্যে নবীনগর-চন্দ্রা সড়ক, আশুলিয়া, বিরুলিয়া রুট, হেমায়েতপুর সিংগাইর রুট, তেঁতুলঝোড়া ও ভাকুর্তার রুট দিয়ে যাতায়াতের পথ রয়েছে। আছে নদীপথে চলাচলের সুযোগ। একাধিক রুট থাকায় অপরাধীরা নির্বিঘ্নে চম্পট দিতে পারে।
আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘এখানে অপরাধের শেষ নেই। মাদক ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। মাসে গড়ে ১৫০ এর অধিক মামলা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, এর মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা এবং বাল্য বিয়ের অভিযোগ বেশি। গত জুন মাসে মামলা হয়েছে ১৭১টি।’
সাভার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ সাইফুল আলম বলেছেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এবং অপরাধী সনাক্ত করতে ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ফরম পূরণ শতভাগ নিশ্চিতকরণে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মাসে গড়ে ১০০ থেকে ১২০টি মামলা হয়। এর অর্ধেক মাদক সংক্রান্ত। এর পর নারী নির্যাতন মামলা ও পরে থাকে অন্যান্য অপরাধের মামলার সংখ্যা।
নদী বেষ্টিত কাউন্দিয়া: তুরাগ-বুড়িগঙ্গা নদীর সংযোগ স্থলে গড়ে উঠা কাউন্দিয়া সাভারের একটি ইউনিয়ন। এখানকার বাসিন্দাদের যোগাযোগ মিরপুর কেন্দ্রীক। জমি রেজিস্ট্রি, থানায় মামলা ও প্রাতিষ্ঠানিক কোন কাজ ছাড়া তারা সাভারে যান না।
নদী বেষ্টিত ইউনিয়নের বাইরে চলাচলের একমাত্র বাহন নৌকা। ঢাকার একেবারে পাশে এই ইউনিয়নে সংযোগের জন্য ব্রিজ নির্মাণে প্রকল্প নিয়ে একাধিক সমীক্ষা যাচাই হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অনেক অপরাধী এই এলাকা বেছে নেয়।
এই ইউনিয়নের দুইজন সাবেক চেয়ারম্যান বলেছেন, তুরাগ নদীতে সংযোগ ব্রিজ এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি। বাসিন্দাদের সবাই দলমত নির্বিশেষে ঢাকার মধ্যে ঢুকে যেতে চান। সাভার থানার বদলে ইউনিয়ন দারুস সালামের অন্তর্ভুক্ত হলে নাগরিক সুবিধা সহজ হবে। অপরাধীরাও সাহস হারাবে।
Leave a Reply