
সংবাদ রিপোর্ট : ঢাকা-১৯ (সাভার-আশুলিয়া) আসনে মোট ভোটারের অর্ধেক পুরুষ- অর্ধেক নারী। ৭ লাখ ৪৭ হাজার ৭০ জন ভোটারের মধ্যে নারী ৩ লাখ ৬৭ হাজার ১৫০ ও পুরুষ ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯০৭। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১৩ জন। মোট ভোট কেন্দ্র ২৭৫ টি। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮টি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ৮ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হলেও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অনেক কারণে এগিয়ে আছেন। জামায়াত প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে এনসিপিকে সমর্থন দিলেও নতুন এই প্রার্থী তৃণমূলে সাড়া জাগাতে পারছেন না। সংগঠন না থাকায় জাতীয় পার্টির প্রার্থীর প্রচারণা চলছে নিরবে। এনপিপি, এলডিপি, জিওপি, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের অনেকের মাইকিং হঠাৎ শোনা গেলেও ভোটের মাঠে তারা ফ্যাক্টর নয়। এনসিপি প্রার্থীর ভরসা জামায়াতের ভোট ব্যাংক। ভোটারদের মধ্যে জন্মসূত্রে স্থানীয়রা এখানে জয় পরাজয়ে ফ্যাক্টর না। শ্রমজীবি মানুষ মূলত এখানকার ভাগ্য নিয়ন্ত্রক। আওয়ামী লীগ ছাড়া এই নির্বাচন অনেকটা নিরুত্তাপ হলেও বিএনপি ও এনসিপির প্রার্থী জয়ের লক্ষ্যে প্রচারনা ও গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে অজানা আশঙ্কায় ভোটার উপস্থিতি কতোটা হবে এনিয়ে সংশয় কাটছে না। উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাভার পৌরসভা, সাভার সদর ইউনিয়ন, পাথালিয়া, আশুলিয়া, ইয়ারপুর, শিমুলিয়া, ধামসোনা ও বিরুলিয়া ইউপির ভোটাররা এই আসনের অন্তর্গত। এই আসনে এবার ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এরা হলেন- বিএনপির নির্বাচনী সমঝোতা জোটের প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য, ঢাকা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু (ধানের শীষ), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী (ছাতা), জামায়াত ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরীক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দিলশানা পারুল (শাপলা কলি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ ফারুক খান (হাতপাখা), ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. ইসরাফিল হোসেন সাভারী (আম), বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. কামরুল (হারিকেন), জাতীয় পার্টির মো. বাহাদুর ইসলাম ইমতিয়াজ (লাঙ্গল) ও গণঅধিকার পরিষদের (জিওপি) শেখ শওকত হোসেন (ট্রাক)।
বড় ব্যবধানে জয়ের চ্যালেঞ্জ ডা. সালাউদ্দিনের : দলের মনোনয়ন বঞ্চিত অন্যদের সঙ্গে যুবদল, ঢাকা জেলা সেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, কৃষকদল, শ্রমিক দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে সাংগঠনিক তৎপরতা চালানোয় ভোটের মাঠে সাড়া জাগিয়েছেন বিএনপির প্রার্থী, সাবেক সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মো. সালাউদ্দিন বাবু। প্রচারনায় তিনি বলছেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে এই অঞ্চলে সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘ সময়ের পরীক্ষিত তাদের পরিবার। স্বাভাবিক উন্নয়নমূলক কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে নতুন কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে উঠোন বৈঠক, পথসভা ও জনসংযোগ করছেন। নেতাকর্মীদের পাশাপাশি স্ত্রী সাবিনা সিদ্দিকা রিতা ও দুই ভাই দেওয়ান মাইন উদ্দিন বিপ্লব, দেওয়ান মহিউদ্দিন বিকাশ তার সঙ্গে থাকছেন ছায়াসঙ্গী হিসেবে। প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের দুর্বল না ভেবে নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্যে চ্যালেঞ্জ নিয়ে গ্রামের পাড়া মহল্লায় ছুটছেন তিনি। সব ধর্মের মানুষের কাছে তিনি ভোট প্রার্থনা করছেন। তার লক্ষ্য বড় ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করা।
নির্বাচিত হলে ১০০ দিনের অগ্রাধিকার পরিকল্পনা ঘোষণা করে প্রচারনা চালাচ্ছেন তিনি। এর মধ্যে মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধে তিনি চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছেন। যানজট নিরসনে তার পরিকল্পনা ও পুলিশের সহযোগিতা চেয়ে চেকপোষ্ট স্থাপনের উদ্যোগে তিনি সাড়া ফেলেছেন। দুইবারের সাবেক এই এমপি বলেছেন, তিনি এই আসনে পঞ্চমবারের মতো ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী হয়েছেন। তার বাবা মরহুম দেওয়ান ইদ্রিস সংসদ সদস্য ছিলেন, ছোটভাই দেওয়ান মাইন উদ্দিন বিপ্লব ইয়ারপুর ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। ভগ্নিপতি হুমায়ুন কবীর আশুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদে দীর্ঘ সময় ধরে চেয়ারম্যান ছিলেন।
পারুলের ভরসা জামায়াত: ঢাকার পাশের এই আসনে এনসিপি সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। তাদের সহযোগি সংগঠন থাকলেও ভোটের মাঠে নবীশ হওয়ায় তারা জনমনে নতুন কোনো ভাবনা জাগাতে পারছে না। এমনকি একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকায় অনেক হুট করে দিলশানা পারুলকে প্রার্থী ঘোষণা করায় অন্যরা নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। এনসিপির সঙ্গে জোট ঘোষণা হওয়ার আগে এই আসনে প্রার্থী হিসাবে মাঠে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা জেলার সেক্রেটারি মাওলানা আফজাল হোসাইন। তারও আগে পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর, ঢাকা জেলা কমিটির রাজনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক হাসান মাহাবুব মাষ্টার প্রার্থী হবেন এই আসনে- এমন প্রচারনা চালানো হয়। কিন্তু শেষ মুহুর্তে জোটের কারণে জামায়াতের আফজাল হোসাইন প্রার্থীতা প্রত্যাহার করলে এনসিপির পারুল হন তাদের সমর্থিত প্রার্থী। তবে জামায়াতের সমর্থন পেয়েও পারুল ভোটারদের মধ্যে সাড়া জাগাতে পারেননি। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পারুল বলতে গেলে ভোটের মাঠে একবারে নতুন মুখ। বামপন্থী রাজনীতি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে ঢাকার শাহবাগে আন্দোলনে থাকা এমন নানা আলোচনায় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা প্রথমে পারুলকে সহজে গ্রহণ করতে পারছিল না। এর মধ্যে তার মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে স্থানীয় জুলাই যোদ্ধাদের অনেকে বিক্ষোভ করেছে। ‘ধাক্কা কাটিয়ে’ জামায়াত নেতাদের নিয়ে একটি রেষ্টুরেন্টে বৈঠক করেন পারুল। বৈঠকে তিনি তার সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। পরে অনেকটা জামায়াতের ভরসায় মাঠে নামেন তিনি। এনসিপির কয়েকজন নেতাকর্মী নিয়ে প্রচারনা ও জনসংযোগ করে ভোটারদের সামনে আগামির পরিকল্পনা তুলে ধরছেন তিনি। তাদের প্রচারণায় এনসিপির দলীয় প্রতীক শাপলা কলি প্রতীকের চেয়ে হ্যাঁ ভোটের গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। জামায়াতের নেতৃত্ব পর্যায়েও হ্যাঁ ভোটের কথা বলা হচ্ছে। কেন্দ্র কমিটি ও আর্থিক যোগানে এই আসনে পারুলের ভরসা জোটমিত্র জামায়াত। অবশ্য জামায়াতের নেতাকর্মীরা দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িপাল্লার জন্য ভোট চেয়ে এখন কিভাবে শাপলাকপি প্রতীকে ভোট চাইবেন এনিয়ে তাদের অনেকে দ্বিধায় পড়েছেন। এ অবস্থায় বিএনপির ঝানু প্রার্থী ডা. সালাউদ্দিনকে পারুল তার জোটসঙ্গীদের নিয়ে কতোটা মোকাবেলা করতে পারবেন তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আসনটিতে শুরুতে এনসিপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে দলের যুগ্ম সদস্যসচিব ও শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ শান্ত মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত তা জমা দেননি। সেজুতি হোসাইন নামে দলের এক নেত্রী নিজের প্রচারনা চালিয়ে মনোনয়ন বঞ্চিত হলে নেই পারুলের প্রচারণায়। আবার পারুলের অশ্লীল গালিগালাজের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ভোটাররা বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। জামায়াত নেতা আফজাল হোসাইন ও হাসান মাহাবুব মাষ্টার, জামায়াতে ইসলামী ঢাকা জেলার আইন বিষয়ক সেক্রেটরী এডভোকেট মো. শহিদুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহাদাৎ হোসেন, সহকারী সেক্রেটারী মাওলানা শাহাদাত হোসেন, সাভার থানার আমীর মো. আব্দুল কাদের, পৌর জামায়াতের সেক্রেটারী আব্দুল কাদের, জামায়াত নেতা সোহেল, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের (মামুনুল হক) নেতা খন্দকার কাওছার হোসাইন ও আব্দুস সবুর খান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাভার উপজেলার প্রধান সমন্বয়কারী জুলকার নাইন ও মো: সালামত উল্লাহ প্রমুখ জোট প্রার্থী পারুলের জন্য কাজ করছেন।
Leave a Reply